সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসকেরা শিশুর নাভির কর্ডটি ক্ল্যাম্প দিয়ে কেটে দেন। এর ফলে শিশুর পেটের ওপর ছোট্ট একটি নাভির অংশ বা স্ট্যাম্প (Umbilical Cord Stump) অবশিষ্ট থাকে। প্রথম সন্তানের বাবা-মায়ের কাছে এই ছোট কাঁচা অংশটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় ও দ্বিধা কাজ করে—"কীভাবে নাভি পরিষ্কার রাখব?", "হাত দিলে কি বাচ্চা ব্যথা পাবে?", কিংবা "নাভিতে পানি লাগলে কি ইনফেকশন হবে?"
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, নাভির কর্ডে কোনো স্নায়ু বা নার্ভ এন্ডিং থাকে না; তাই নাভি স্পর্শ করলে বা পরিষ্কার করলে শিশু কোনো ব্যথা পায় না। তবে নাভি হলো শিশুর সরাসরি রক্তসংবহনের একটি প্রবেশদ্বার। সঠিক নিয়মে যত্ন না নিলে এটি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণ হতে পারে। কীভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নাভির যত্ন নেবেন এবং কোন ভুলগুলো কখনোই করবেন না, তা বিস্তারিত জেনে নিন:
নাভি শুকিয়ে খসে পড়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ও সময়সীমা
জন্মের পর নাভির স্ট্যাম্পটি প্রথমে চকচকে নীলচে-সাদা বা হলুদ রঙের থাকে। সময়ের সাথে সাথে এটি শুকিয়ে শক্ত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে বাদামি ও সবশেষে কালো বর্ণ ধারণ করে।
- কখন খসে পড়ে? সাধারণত জন্মের ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে নাভির কর্ডটি নিজে থেকেই শুকিয়ে স্বাভাবিকভাবে খসে পড়ে।
- কিছু কিছু শিশুর ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ ২১ দিন (৩ সপ্তাহ) পর্যন্ত সময় নিতে পারে।
- মনে রাখবেন, নাভিটি শুকিয়ে ঝুলে থাকলেও কখনোই নিজ থেকে টেনে ছেঁড়ার চেষ্টা করবেন না। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিজে নিজেই খসে পড়া অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) স্বীকৃত 'Dry Cord Care' বা শুষ্ক পরিচর্যা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শিশুরোগ বিশেষজ্ঞদের সর্বসম্মত নির্দেশিকা হলো: "Dry Cord Care" বা নাভিকে সবসময় সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও শুকনা রাখা।
প্রতিদিনের যত্নের ধাপসমূহ:
১. হাত ভালো করে ধুয়ে নিন: শিশুকে স্পর্শ করার বা নাভির পরিচর্যা করার আগে সবসময় সাবান-পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড হাত ধুয়ে পরিষ্কার শুকনো তোয়ালে দিয়ে মুছে নিন। ২. বাতাস চলাচল করতে দিন: নাভি যত বেশি খোলা বাতাসে থাকবে, তত দ্রুত শুকাবে। ডায়াপার পরানোর সময় ডায়াপারের কোমর নাভির অংশটির সামান্য নিচে ভাঁজ (Fold down) করে দিন। এতে নাভিতে ডায়াপারের ঘষা লাগবে না এবং প্রস্রাবের স্যাঁতসেঁতে ভেজাভাব নাভি পর্যন্ত পৌঁছাবে না। ৩. ঢিলেঢালা সুতি পোশাক: শিশুকে সবসময় নরম, হালকা ও ঢিলেঢালা সুতি জামা পরান যাতে নাভির ওপর চাপ না পড়ে।
নাভি পড়ার আগে শিশুর গোসলের নিয়ম
নাভির কর্ড পুরোপুরি শুকিয়ে নিজে থেকে খসে পড়ার আগ পর্যন্ত শিশুকে পানির টাব বা বালতিতে ডুবিয়ে গোসল করানো উচিত নয়।
- এই সময়ে স্পঞ্জ বাথ (Sponge Bath) বা কুসুম গরম পানিতে নরম সুতি তোয়ালে ভিজিয়ে হালকা চিপে শিশুর শরীর মুছে দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
- মুখ, ঘাড়ের ভাঁজ, বগল ও ডায়াপারের অংশ সুন্দর করে মুছে নিন, কিন্তু নাভির অংশটিতে পানি লাগানো পরিহার করুন।
- যদি দুর্ঘটনাবশত নাভিতে সামান্য পানি লেগে যায়, তবে ভয় না পেয়ে সাথে সাথে পরিষ্কার জীবাণুমুক্ত তুলা বা নরম কাপড় দিয়ে আলতো করে চেপে চেপে শুকিয়ে নিন।
আমাদের দেশে প্রচলিত মারাত্মক ৫টি ভুল ও কুসংস্কার
আমাদের দেশের পারিবারিক ও লোকজ অভ্যাসে নবজাতকের নাভি নিয়ে বহু বিপজ্জনক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে, যা শিশুর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে:
- ১. সরিষার তেল বা ঘি লাগানো: অনেকেই ভাবেন নাভিতে সরিষার তেল দিলে নাভি নরম হয়ে দ্রুত পড়বে। এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ও মারাত্মক ক্ষতিকর ধারণা! তেলে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়া নাভির উন্মুক্ত রক্তনালী দিয়ে রক্তে মিশে সেপসিস (Sepsis) বা রক্তের মারাত্মক সংক্রমণ তৈরি করতে পারে।
- ২. স্যাভলন, ডেটল বা হেক্সিসল ঢালা: অনেকেই অতিরিক্ত জীবাণুমুক্ত করার আশায় নাভিতে অ্যান্টিসেপটিক লোশন বা স্পিরিট ঘষে দেন। গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিসেপটিক দিলে নাভির প্রাকৃতিক কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নাভি শুকাতে উল্টো দ্বিগুণ সময় লাগে। চিকিৎসকের বিশেষ প্রেসক্রিপশন ছাড়া নাভিতে কিছুই দেবেন না।
- ৩. চালের গুঁড়ো, চুন বা ভেষজ ছাই দেওয়া: গ্রামেগঞ্জে এখনো নাভিতে এসব উপাদান দেওয়ার ঘটনা দেখা যায়, যা নবজাতকের ধনুষ্টঙ্কার (Neonatal Tetanus) ও প্রাণঘাতী ইনফেকশনের অন্যতম প্রধান কারণ।
- ৪. কয়েন বা পয়সা চেপে বেঁধে রাখা: অনেকে ভাবেন নাভি ফুলে থাকা আটকাতে মুদ্রা চেপে পট্টি বাঁধলে নাভি সুন্দর গোল হবে। এটি কুসংস্কার ছাড়া কিছুই নয়; বরং এতে রক্ত চলাচল ব্যাহত হয় ও ইনফেকশন বাড়ে।
- ৫. পাউডার ছিটানো: নাভিতে কোনো ধরনের ট্যালকম পাউডার বা অ্যান্টিবায়োটিক ডাস্টিং পাউডার দেওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ।
নাভি খসে পড়ার ঠিক পরের ২-৩ দিনের যত্ন
নাভি খসে পড়ার পর পেটের ভেতরের অংশটি হালকা গোলাপি কাঁচা মাংসের মতো দেখতে লাগতে পারে। এ সময়ে ১ বা ২ ফোঁটা হালকা রক্তের দাগ ডায়াপারে বা পোশাকে লাগা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। এ নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। স্থানটি পরিষ্কার ও শুষ্ক রাখুন; ২-৩ দিনের মধ্যে এটি পুরোপুরি শুকিয়ে শিশুর চামড়ার সাথে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
বিপদচিহ্ন (Omphalitis): কখন তাৎক্ষণিক চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নাভির ইনফেকশনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ওমফালাইটিস (Omphalitis) বলা হয়। নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে তাৎক্ষণিক শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যান:
- নাভির গোড়া ও চারপাশের চামড়া অতিরিক্ত লাল হয়ে ফুলে যাওয়া।
- নাভি থেকে দুর্গন্ধযুক্ত হলুদ বা সবুজ রঙের পুঁজ নির্গত হওয়া।
- নাভি থেকে অবিরাম তাজা রক্তক্ষরণ হওয়া (রক্ত পড়া বন্ধ না হওয়া)।
- নাভির অংশ স্পর্শ করলে শিশু তীব্র ব্যথায় কেঁদে ওঠা।
- শিশুর শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া (১০০.৪° ফারেনহাইট বা তার বেশি জ্বর)।
- শিশু দুধ খাওয়া ছেড়ে দেওয়া বা অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়া।

