বাংলাদেশের তীব্র আর্দ্র ও উষ্ণ আবহাওয়ায় নবজাতক ও ছোট শিশুদের যে সমস্যাটি প্রায় প্রতিটি পরিবারে দেখা দেয়, তা হলো ডায়াপার র্যাশ (Diaper Rash)। শিশুর স্পর্শকাতর ত্বকে লালচে ছোপ ছোপ দাগ, ফুসকুড়ি বা জ্বালাপোড়া তৈরি হলে শিশু চরম অস্বস্তিতে ভোগে, প্রস্রাব-পায়খানার সময় ব্যথায় চিৎকার করে কাঁদে এবং রাতে শান্তভাবে ঘুমাতে পারে না।
অনেক বাবা-মা ভাবেন ডায়াপার ভালো মানের না হওয়ার কারণেই হয়তো এমনটা হচ্ছে। তবে মূল সত্য হলো, সবচেয়ে দামি ডায়াপার পরালেও যদি সঠিক নিয়ম ও ত্বকের সুরক্ষা না মানা হয়, তবে র্যাশ হওয়া অনিবার্য। সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে ঘরে বসেই ডায়াপার র্যাশ শতভাগ প্রতিরোধ ও দ্রুত নিরাময় করা সম্ভব।
ডায়াপার র্যাশ কেন হয়?
শিশুর ত্বক বড়দের ত্বকের চেয়ে প্রায় ৩০% বেশি পাতলা ও সংবেদনশীল। ডায়াপার র্যাশ হওয়ার প্রধান কারণগুলো হলো: ১. আর্দ্রতা ও ইউরিয়ার দীর্ঘ সংস্পর্শ: ডায়াপারের ভেতর দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব ও মল জমে থাকলে মলমূত্রের অ্যামোনিয়া ত্বকের প্রাকৃতিক অ্যাসিডিক ব্যারিয়ার নষ্ট করে ফেলে। ২. ঘর্ষণ (Friction): অতিরিক্ত টাইট ডায়াপার পরালে হাঁটাচলা বা পা নাড়াচাড়ার সময় ত্বকে ঘষা লেগে ছাল উঠে যায়। ৩. রাসায়নিক সুগন্ধি ও অ্যালকোহল: সুগন্ধিযুক্ত বেবি ওয়াইপস বা তীব্র রাসায়নিকযুক্ত সাবান শিশুর ত্বকে অ্যালার্জি ও ডার্মাটাইটিস তৈরি করে। ৪. ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ (Yeast Infection): ডায়াপারের ভেতরের উষ্ণ ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ক্যান্ডিডা অ্যালবিকানস নামক ছত্রাকের বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ জায়গা।
ডায়াপার র্যাশ প্রতিরোধের ৪টি সোনালী নিয়ম
- ১. নিয়মিত ও দ্রুত ডায়াপার পরিবর্তন: ডায়াপার ভিজে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন না। দিনে প্রতি ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পরপর ডায়াপার চেক করুন। আর শিশু মলত্যাগ করার সাথে সাথে মুহূর্তের মধ্যে ডায়াপার খুলে পরিষ্কার করে দিন।
- ২. কুসুম গরম পানি ও নরম সুতি কাপড়: সুগন্ধি ও অ্যালকোহলযুক্ত ওয়াইপসের বদলে ঘরে সবসময় একটি পাত্রে কুসুম গরম পানি এবং নরম সুতি কাপড় বা তুলা রাখুন। আলতো করে মুছে ত্বক পরিষ্কার করুন। ঘষাঘষি (Rubbing) না করে আলতো চাপ দিয়ে (Pat dry) পরিষ্কার করুন।
- ৩. ত্বক সম্পূর্ণ শুকাতে দিন: ডায়াপার খোলার পর ভেজা ত্বকে কখনোই সাথে সাথে নতুন ডায়াপার পরাবেন না। অন্তত ২-৩ মিনিট খোলা বাতাসে স্থানটি সম্পূর্ণ শুকাতে দিন।
- ৪. প্রতিদিন ১-২ ঘণ্টা "Diaper-Free Time": প্রতিদিন দিনের বেলায় শিশুকে ডায়াপার ছাড়া একটি নরম সুতি কাঁথার ওপর শুইয়ে রাখুন যাতে তার ত্বকে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করতে পারে। বাতাসই ডায়াপার র্যাশের সেরা প্রাকৃতিক প্রতিষেধক।
ব্যারিয়ার ক্রিমের সঠিক ব্যবহার (Zinc Oxide & Petroleum Jelly)
ডায়াপার পরানোর আগে শিশুর ত্বকের ওপর একটি সুরক্ষামূলক স্তর বা ব্যারিয়ার তৈরি করা জরুরি।
- জিংক অক্সাইড (Zinc Oxide Cream): এটি ডায়াপার র্যাশ প্রতিরোধ ও সারানোর জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান স্বীকৃত সেরা উপাদান। এটি ত্বকের ওপর একটি সাদা সুরক্ষামূলক প্রলেপ তৈরি করে, যা প্রস্রাব ও মলকে সরাসরি ত্বকের সংস্পর্শে আসতে দেয় না।
- খাঁটি পেট্রোলিয়াম জেলি (White Petroleum Jelly): ডায়াপার পরানোর আগে পাতলা করে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগিয়ে দিলে ঘর্ষণজনিত জ্বালাপোড়া অনেকটাই রোধ হয়।
প্রচলিত বিপজ্জনক ভুল: ট্যালকম পাউডার ব্যবহারের ক্ষতি
আমাদের দেশে বহু পরিবার এখনো ডায়াপারের অংশে সুগন্ধি ট্যালকম পাউডার ছিটিয়ে দেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান এটি সম্পূর্ণ নিষেধ করেছে। কারণ:
- পাউডারের সূক্ষ্ম কণা বাতাসে উড়ে শিশুর সংবেদনশীল ফুসফুসে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
- প্রস্রাবের সংস্পর্শে এসে পাউডার জমাট বেঁধে লেই (paste) তৈরি করে, যা ত্বকের রোমকূপ বন্ধ করে দিয়ে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক সংক্রমণ আরও তীব্র করে তোলে।
সাধারণ র্যাশ বনাম ছত্রাক (Yeast) সংক্রমণ চেনার উপায়
- সাধারণ ডায়াপার র্যাশ: সাধারণত ডায়াপার যে অংশগুলোতে ত্বকে সরাসরি ঘষা খায় (যেমন উরু ও কোমরের খাঁজ ছাড়া বাকি অংশে) সেখানে হালকা লালচে ভাব দেখা যায় এবং বাতাস লাগলে ও ব্যারিয়ার ক্রিম দিলে ২-৩ দিনে সেরে যায়।
- ছত্রাক বা ইস্ট সংক্রমণ: যদি কুঁচকি ও ত্বকের গভীর ভাঁজের ভেতরে তীব্র চকচকে লাল দাগ হয় এবং তার চারপাশে ছোট ছোট লাল গুটি বা ফুসকুড়ি (Satellite lesions) ছড়িয়ে পড়ে—তবে এটি ছত্রাক সংক্রমণ। সাধারণ ক্রিমে এটি সারে না; এর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম ব্যবহার করতে হয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
- র্যাশ ৩ দিনের বেশি স্থায়ী হলে এবং ঘরোয়া যত্নে উন্নতি না হলে।
- ত্বকে ফোসকা পড়া, চামড়া উঠে ঘা হওয়া বা রক্ত ও পুঁজ বের হলে।
- র্যাশের সাথে শিশুর জ্বর আসা এবং প্রচণ্ড কান্নাকাটি করা।

