নবজাতকের কান্নার আওয়াজ পৃথিবীর সবচেয়ে স্পর্শকাতর শব্দগুলোর একটি। শিশু একটানা কাঁদতে থাকলে বিশেষ করে নতুন বাবা-মায়েরা আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েন। অনেকেই মনে করেন শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে কিংবা মা পর্যাপ্ত দুধ খাওয়াতে পারছেন না।
কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রথম পাঠ হলো: কান্না নবজাতকের জন্য কোনো বিপদের স্থায়ী সংকেত নয়; এটি তার মনের ভাব প্রকাশের একমাত্র ভাষা। শিশু কথা বলতে পারে না, তাই নিজের যেকোনো শারীরিক অস্বস্তি, ক্ষুধা, ক্লান্তি কিংবা আদরের স্পর্শ চাওয়ার কথা সে কান্নার মাধ্যমেই প্রকাশ করে। কান্নার কারণগুলো বুঝতে পারলে এবং শান্ত করার বৈজ্ঞানিক উপায় জানা থাকলে শিশুর লালন-পালন অনেক বেশি সহজ ও আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে।
নবজাতকের কান্নার প্রধান ৭টি কারণ
১. ক্ষুধা (Hunger): নবজাতকের কান্নার সবচেয়ে সাধারণ কারণ ক্ষুধা। শিশু যখন ক্ষুধার্ত হয়, তীব্র কান্নার আগেই সে কিছু প্রাথমিক সংকেত দেয় (যেমন: মাথা এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে মায়ের বুক খোঁজা, হাত মুঠো করে মুখে দেওয়া বা ঠোঁট নাড়ানো)। এই লক্ষণগুলো খেয়াল না করলে শিশু জোরে কাঁদতে শুরু করে। ২. ভেজা বা নোংরা ডায়াপার: ভেজা প্রস্রাব বা মলের কারণে ত্বকে অস্বস্তি হলে অনেক শিশু অস্বস্তিতে কান্নাকাটি করে। ৩. পেটে গ্যাস বা ঢেকুরের অভাব: দুধ পানের সময় শিশুর পেটে বাতাস ঢোকে। খাওয়ার পর সঠিকভাবে ঢেকুর না তোলালে পেটে গ্যাস জমে মৃদু ব্যথা তৈরি হয়, যার ফলে শিশু পা পেটের দিকে কুঁকড়ে কাঁদতে থাকে। ৪. অতিরিক্ত ক্লান্তি (Overtiredness): বড়দের মতো শিশুরা নিজে নিজে ঘুমাতে পারে না। অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লে তাদের স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে যায় এবং তারা ঘুমানোর জন্যই কাঁদতে থাকে। ৫. অতিরিক্ত উদ্দীপনা (Over-stimulation): অনেক মানুষের কোলাহল, তীব্র উজ্জ্বল আলো, লাউড স্পিকারের শব্দ বা হাতবদল হওয়া শিশুর নরম মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে ফেলে। ৬. তাপমাত্রার অস্বস্তি: শিশুকে খুব বেশি গরমের কাপড় পরালে কিংবা ঘর অতিরিক্ত ঠান্ডা হলে শিশু বিরক্ত হয়ে কাঁদে। মনে রাখবেন, বড়দের চেয়ে শিশুর শুধু একটি পাতলা লেয়ার বেশি প্রয়োজন। ৭. স্নেহের স্পর্শ চাওয়া: মায়ের গর্ভের নিরাপদ ও ওম পরিবেশ ছেড়ে বাইরের অচেনা পৃথিবীতে এসে নবজাতক ভয় পায়। সে শুধু মায়ের বুকে জড়িয়ে থেকে আশ্বস্ত হতে চায়।
কান্নারত শিশুকে শান্ত করার বৈজ্ঞানিক ৫-S পদ্ধতি
বিশ্বখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হার্ভি কার্প (Dr. Harvey Karp) নবজাতকের গর্ভের অনুভূতি ফিরিয়ে দিয়ে শান্ত করার একটি বিখ্যাত ৫-S পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন:
- ১. Swaddle (আরামদায়কভাবে জড়ানো): নরম পাতলা সুতি কাপড় দিয়ে শিশুর হাত দুটিকে আলতো করে শরীরের সাথে জড়িয়ে দিন (তবে পা ও কোমরের অংশ ঢিলেঢালা রাখুন যাতে হিপ ডিসপ্লেসিয়া না হয়)। এটি শিশুর আকস্মিক চমকে ওঠা (Moro reflex) বন্ধ করে নিরাপত্তা দেয়।
- ২. Side or Stomach position (কোলে নেওয়ার সঠিক ভঙ্গি): শিশুকে কোলে নেওয়ার সময় একপাশে কাত করে বা নিজের বাহুর ওপর পেটের দিক রেখে ধরুন। (সতর্কতা: এটি শুধুই কোলে রেখে শান্ত করার জন্য; বিছানায় ঘুমানোর সময় সবসময় চিত করে শোয়াতে হবে)।
- ৩. Shush (শ্বুশ-শ্বুশ শব্দ বা White Noise): শিশুর কানের কাছে মৃদু কিন্তু স্পষ্ট সুরে "শ্বুশ... শ্বুশ..." শব্দ করুন অথবা মৃদু ফ্যানের আওয়াজ ছেড়ে রাখুন। এটি গর্ভে রক্তের প্রবাহের শব্দের সাথে মিলে যায় এবং শিশুকে শান্ত করে।
- ৪. Swing (ছন্দের আলতো দোলানি): শিশুকে কোলে নিয়ে মৃদু ও ছন্দময় গতিতে দোল দিন।
- ৫. Suck (চোষার অনুভূতি): চোষার মাধ্যমে নবজাতকের মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসৃত হয়ে প্রশান্তি আনে। মা বুকের দুধ দিতে পারেন অথবা পরিষ্কার আঙুল দিতে পারেন।
কোলিক (Colic) কান্না কী?
যদি কোনো সুস্থ শিশু দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি, সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন এবং টানা ৩ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কোনো প্রকাশ্য কারণ ছাড়াই তীব্রস্বরে কাঁদে (সাধারণত সন্ধ্যার দিকে শুরু হয়)—তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে কোলিক (Colic) বলা হয়। এটি কোনো রোগ নয়; শিশুর অপরিণত পাচনতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশজনিত একটি পর্যায়, যা সাধারণত ৩-৪ মাস বয়সে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। কোলিকের সময় শিশুকে কোলে নিয়ে পেটে আলতো ম্যাসাজ এবং স্কিন-টু-স্কিন স্পর্শ খুব ভালো কাজ করে।
মারাত্মক সতর্কতা: কখনোই শিশুকে ঝাঁকুনি দেবেন না
বাচ্চা একটানা কাঁদলে কোনো কোনো অভিভাবক চরম হতাশায় শিশুকে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেন। এটি একটি প্রাণঘাতী ভুল! নবজাতকের ঘাড়ের পেশি দুর্বল এবং মস্তিষ্ক অত্যন্ত নরম থাকে। শিশুকে জোরে ঝাঁকুনি দিলে মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে স্থায়ী অন্ধত্ব, মস্তিষ্কের ক্ষতি বা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে শেকেন বেবি সিন্ড্রোম (Shaken Baby Syndrome) বলা হয়। ধৈর্য হারিয়ে ফেললে শিশুকে নিরাপদ বিছানায় শুইয়ে নিজে অন্য রুমে গিয়ে ৫ মিনিট শান্ত হয়ে আসুন, কিন্তু কখনোই শিশুর ওপর শারীরিক বলপ্রয়োগ করবেন না।
কখন জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
- শিশুর সাথে উচ্চ জ্বর (১০০.৪° ফারেনহাইট বা তার বেশি) থাকলে।
- অনবরত পিত্তযুক্ত সবুজ বা হলুদ বমি করলে।
- শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়লে এবং চোখ মেলতে না পারলে।
- কান্নার সুর যদি অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ বা দুর্বল গোঙানির মতো শোনায়।

